Menu

বাংলার বাইরে সমাজসংস্কার আন্দোলনে প্রার্থনাসমাজ ও আর্যসমাজের ভূমিকা লেখ

বাংলার বাইরে সমাজসংস্কার আন্দোলনে প্রার্থনাসমাজ ও আর্যসমাজের ভূমিকা লেখ

ব্রিটিশ শাসনকালে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বাংলার বাইরেও বিভিন্ন সমাজ সংস্কারক সংস্কার আন্দোলন করেন। বাংলার বাইরে একাজে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এমন দুটি প্রতিষ্ঠান হলো—প্রার্থনাসমাজ এবং আর্যসমাজ।

প্রার্থনাসমাজের ভূমিকা

মহারাষ্ট্রের সমাজসংস্কারক আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ কেশবচন্দ্র সেনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রে প্রার্থনাসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে বিচারপতি মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও ঐতিহাসিক রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর প্রার্থনাসমাজে যোগ দিলে প্রার্থনাসমাজের সংস্কারমূলক কার্যাবলি যথেষ্ট গতি পায়।

(ক) সমাজসংস্কার

ধর্ম অপেক্ষা সমাজসংস্কারেই সংস্কারকগণ বেশি আগ্রহী ছিলেন। সামাজিক উন্নয়ন ও নারী কল্যাণের ক্ষেত্রে তাঁরা অসবর্ণ বিবাহ, বিধবাবিবাহ, পর্দাপ্রথা বর্জন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রদ, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার এবং অনাথ আশ্রম, বিধবা আশ্রম, চিকিৎসালয় স্থাপন প্রভৃতি কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

(খ) শিক্ষার প্রসার

প্রার্থনাসমাজের উদ্দেশ্য সফল করে তোলার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ‘দাক্ষিণাত্য শিক্ষাসমাজ’ বা ‘ডেকান এডুকেশন সোসাইটি (১৮৮০ খ্রি.) গঠন করেন। এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফারগুসন কলেজ’ এবং ‘উইলিংডন কলেজ’। ভারতীয়দের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে রানাডে পুনায় ‘সার্বজনিক সভা’ (১৮৭০ খ্রি.) প্রতিষ্ঠা করেন।

আরো পড়ুন :  সমাজ ও শিক্ষাসংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের অবদান লেখ

(গ) নারীকল্যাণ

নারীকল্যাণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনাসমাজ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। বাল্যবিবাহ নিবারণ, বিধবাবিবাহের প্রসার, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতি বিষয়ে তাঁরা সক্রিয় উদ্যোগ নেয়। মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ‘বিধবাবিবাহ সমিতি’ (১৮৬১ খ্রি.) গঠন করেন।

মূল্যায়ন

মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রার্থনাসমাজের আন্দোলনকে খুবই সক্রিয় করে তোলেন। দীনবন্ধু এন্ড্রুজ এর মতে, সংস্কারক হিসেবে তিনি রামমোহন ও স্যার সৈয়দ আহমদের প্রায় কাছাকাছি ছিলেন। মহারাষ্ট্র, মাদ্রাজ ও অস্ত্রের তেলুগু ভাষাভাষী অঞ্চলে ‘প্রার্থনাসমাজ’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আর্যসমাজের ভূমিকা

ঊনবিংশ শতকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সংস্কার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আর্যসমাজ’ এর পরিচালিত আন্দোলন। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইতে ‘আর্যসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচারের ফলে পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট-সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আর্যসমাজের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন :  মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভবের প্রেক্ষাপট আলোচনা কর

(ক) আদর্শ

সত্যার্থ প্রকাশ’ ও ‘বেদভাষা’ নামক হিন্দি গ্রন্থে তাঁর ধর্মীয় মত প্রকাশিত হয়েছে। দয়ানন্দ সরস্বতীর সকল ধর্মীয় আদর্শ ও চিন্তাধারার মূলভিত্তি ছিল বেদ। বৈদিক যুগের গৌরব ও পবিত্রতায় হিন্দুধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ-বিরোধী ছিলেন এবং একেশ্বরবাদের সমর্থক ছিলেন।

(খ) কর্মকাণ্ড

স্বামী দয়ানন্দ বোম্বাইতে আর্যসমাজের প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে সংস্কার কার্য পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি ‘শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্মত্যাগী হিন্দুদের এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরে আনতে সচেষ্ট ছিলেন। শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে লালা হংসরাজ লাহোরে ‘দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ হরিদ্বারে ‘গুরুকুল আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করে প্রাচীন বৈদিক রীতিতে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। দয়ানন্দের নেতৃত্বে আর্যসমাজ জাতিভেদপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সরব হয়। স্বামী দয়ানন্দের অনুগামীরা হলেন লালা হংসরাজ, পণ্ডিত গুরু দত্ত, লালা লাজপত রায়, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ প্রমুখ।

আরো পড়ুন :  ধর্মসংস্কার ও জাতীয়তাবাদের প্রসারে স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ মিশনের ভূমিকা আলোচনা কর

(গ) গুরুত্ব

ভারতীয় জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে স্বামী দয়ানন্দ ও আর্যসমাজের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলি হল—[১] হিন্দুদের হীনম্মন্যতা দূর হয়। [২] বৈদিক হিন্দুধর্ম তার হৃতগৌরব ফিরে পায়। [৩] হিন্দুসমাজে বিভিন্ন জাতপাতের মধ্যে ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে।

মূল্যায়ন

কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্যসমাজের কাজকর্মে প্রতিক্রিয়াশীলতা লক্ষ করা যায়। ড. অমলেশ ত্রিপাঠী দয়ানন্দ সম্পর্কে লিখেছেন যে, “সাম্প্রদায়িকতার উত্তরে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতার উত্তরে অসহিঞ্চুতা দেখিয়েছেন তিনি। অবশ্য কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উনিশ শতকে ধর্ম ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮২৪-১৮৮৩ খ্রি.) ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আর্যসমাজ’ এর অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।

দ্বাদশ ইতিহাসের সুচিপত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!